প্রকাশ: 31 Aug 2025 | 06:20am | আপডেট: 31 Aug 2025 | 06:20am
ঢাকা-দোহার রোডের শ্রীনগরও ভাগ্যকুলের মাঝামাঝি রাড়িখাল মৌজার দক্ষিণপূর্ব কোণে উত্তর কোলাপাড়া, দামলা, মাইজপাড়া ও উত্তর রাড়িখালের সংযোগস্থলে ৫৯ বছরে তিলে তিলে এ বাজারটি গড়ে উঠেছে। ১৯৬৪ সালে আর্মি রফিকও তাঁর বৃদ্ধ পিতা মরহুম ছামেদ আলী ওখানটায় একটি ছাউনি দিয়ে অস্থায়ীভাবে দোকান দিয়ে বসা শুরু করলেন, আগে থেকেই উত্তর কোলাপাড়ার ছামেদ আলীর বাড়ির ঘরে দোকান ছিল, রফিক স্কুলে পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে চাঙারীতে করে প্রতিদিন অল্প পরিমান মালামাল এনে বাবাকে সড়কের পাশে ছাউনিতে বসিয়ে দিয়ে যেতেন। দোকানে নাবিস্কোর টিপা বিস্কুট, মুড়ুলী ও নাবিস্কো লজেন্স কিনে খেত অনেকে, হেঁটে যাওয়া পথিকের চাহিদা অনুযায়ী ডাব বিক্রি শুরু হল, তবে লেইযুক্ত পরিপক্ক ডাবই বেশী বিক্রি হত, এগুলোই সবাই বেশী খেত।
এরপর
দামলার আব্দুল আজিজ (হারুনের বাবা) ও ছমির কাজী
ভাসমান দোকান দিয়ে বসলেন। '৭১
সালে ঢাকার নাবু খাঁ ( উত্তর
কোলাপাড়ার চুন্নু কাকার ভাগ্নিজামাই) রাজাকারদের ভয়ে এখানে এসে
প্রথম চা দোকান দিলেন,
প্রচুর চা বিক্রি হতো,
এ দোকানকে কেন্দ্র করে আমাদের আড্ডা
জমতে শুরু করলো, রাড়িখালের
আমিনুর রহমান খান ও আমান
মাষ্টার এর সাথে সকাল
দুপুর বিকেল তিন বেলাই এখানটায়
আড্ডা ও চা খাওয়া
চলতো। মাথায় বুদ্ধি এলো রেইনট্রি গাছ
লাগানোর- প্রথম মফতআলির (মোসলেমের বাবা) বাড়ি হতে একটি
চারা এনে লাগালাম, বর্ষাকালে
উন্মুক্ত সড়কে ছেড়ে দেয়া
গরুতে গাছ খেয়ে ফেলত,
কষ্ট পেতাম, গরুর মালিকদের সাথে
ঝগড়া করতাম, তারপরও থামি নি, বারে
বারে গাছ লাগাতাম, দুই
বার সাড়ি বেঁধে পন্ডিত
বাড়ি পর্যন্ত কলাগাছও লাগিয়েছিলাম ঝড়ে ভেংগে পড়ে
গেল।
এরপর
উত্তর কোলাপাড়ার যুব সমিতির ফান্ড
থেকে রেইনট্রি গাছ দু'টিতে
বাঁশের বেড়া দিলাম, দু'টি গাছ টিকে
গেল, এ কাজে আমাদের
সাথে অনেকেই ছিল তাঁদের মধ্যে
সালাম, লিটনখান, হাজী বাড়ির কালাম,
হুমায়ুন, আক্কাস,দামলার হারুন, আবুল, জামাল খান, ইউসুফ, মজনু,
রেজ্জাক, আইয়ুব, গফুর ও মিনাল
উল্লেখযোগ্য, মিল্টন ও মিনাল কে
নিয়ে হাইস্কুলে গেলে জগদীশচন্দ্র বসুর
পৈতৃক ভবনের পূর্বদিকের ছাঁদে একটি বট চারা
চোখে পড়ল, বাঁশ লাগিয়ে
মিনালকে উঠিয়ে দিলাম ছোট্ট মিনাল ঠিকই চারাটি তুলে
ফেলল, আমরা সন্ধ্যায় চারাটি
তিন দোকানের মোহনায় লাগিয়ে দিলাম,একটু বড় হলে
অরুন ওরা বটের সাথে
জোড়া দিয়ে একটি পাকুর
গাছ লাগিয়ে দিল, এখন যে
বট গাছটি দৃশ্যমান ওটি আমাদের লাগানো
গাছ।
প্রথম
দিকের তিনটি দোকানকে কেন্দ্র করে এলাকাটি পথিকের
মাঝে তিন দোকান হিসেবেই
চিহ্নিত হতে থাকল, এরপর
ওহাব কাজি, সোনা মিয়াসহ আরো
অনেকে দোকান বসালেও নামের আর পরিবর্তন হয়
নি। আমার কাকা মোফাজ্জল
হোসেন খান কাবিখার টাকা
দিয়ে কোলাপাড়া যাবার খালটি ভরাট করে ফেললেন।
ফলে
এখানে অনেক গুলো নতুন
দোকান হল। কাঁচা সড়কের
শ্রীনগর-ভাগ্যকুল এ অংশে শুষ্ক
মৌসুমে কবুতরখোলার হবিউল হাওলাদার দু'টি পুরনো
জিপগাড়ী পিছনে সিট বানিয়ে চালাতে
শুরু করলে 'তিনদোকান' নামটি আরোও পরিচিতি পায়।
পথিমধ্যে জিপ গাড়ির মালিক
কাঠের সাঁকোগুলোতে আড়াআড়ি কাঠ বিছিয়ে চলাচল
উপযোগী করে নেয়, এরপর
রিক্সা চলাচল শুরু হলে ওয়াপদার
তহবিল দিয়ে দুই লেইন
ধরে ইট বিছানো হয়
ফলে সারা বছর জিপও
রিক্সা চলত।
সড়ক
ও জনপথ অধিদফতর ১৯৯০
সালে রাস্তাটি ইট বিছানো ও
১৯৯৩ সালে পাকা করে
দিলে বাস চলাচলের পথ
সুগম হয়। রাস্তা সম্প্রসারণ
করতে গিয়ে আমাদের লাগানো
পশ্চিম দিকের রেইনট্রি গাছ দু'টি
কাটা পরে। সরকার গাছ
দু'টো অকশনে বিক্রি
করে দেয়। কালের সাক্ষী
হয়ে কেবলএকটি বটগাছই দাঁড়িয়ে আছে। এখন 'তিনদোকানে'
বলতে গেলে সব কিছুই
পাওয়া যায়, অনেক গুলো
ঔষধের দোকান, ফটোস্ট্যাট দোকান, সিলিন্ডার গ্যাসের ডিলার, সারের দোকান, মিষ্টির দোকানসহ নানা ধরণের ব্যবসা
কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে
ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, পরে
সোনালী ব্যাংকের দামলা শাখা নামে একটি
শাখা স্থাপিত হলো। সম্প্রসারমান তিনদোকান
বাজারটি অনেক বড় হলেও
অপরিকল্পিত ভাবে কেবল সড়ক
ধরেই বেড়ে চলেছে, জনগুরুত্ব
বিবেচনা করে পরিকল্পিত বাজার
সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
আড়িয়ল
বিলের মাছ, সব্জী এবং
খাবার হোটেলঃ-তিন দোকান বাজারে
আড়িয়ল বিলের ডাঙা (দিঘী) হতে মাঝে মাঝে
দেশী মাছ বিক্রির জন্য
উঠে, সম্প্রতি এমনই কিছু মাছ
চোখে পড়লো। বাজারে প্রচুর তাজা শাক সবজি
পাওয়া যায়। সকালের নাস্তা
ও দুপুরের/রাতের খাবারের জন্য মোটামুটি মান
সম্পন্ন একটি খাবার হোটেল
দাঁড়িয়ে গেছে। স্থানীয় পর্যটক বা ব্যাচেলর লোকজন
এখানে খাবার খেতে আসছেন। এ
ছাড়া হোটেলে সিংগারা শামুচাসহ অন্যান্য হালকা খাবার ও পাওয়া যায়।
তিনদোকান
বাজারের জোড়া বটগাছটি কাটা
পড়ার ঝুঁকিতেঃ- ঢাকা-দোহার রোডের
শ্রীনগরের পশ্চিমাংশে সড়ক সম্প্রসারণ কাজ
আপাততঃ শেষ হলেও ১৯৭২
সালে লাগানো এ বটগাছটি ভবিষ্যতে
কাটা পড়ার সম্ভাবনা থেকেই
গেলো, কারণ রাস্তাটি আরও
প্রসস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে আরো দুটি
আকাশছোঁয়া রেইনট্রি গাছ কাটা পড়েছিল।
এ গাছগুলো লাগানো এবং পরিচর্যা করার মধুর স্মৃতি এখনও মনে দাগ কেটে আছে। মিল্টন খান এবং মিনালকে নিয়ে বর্ষাকালে বিকেলে হাইস্কুলে বেড়াতে গেলে জগদীশ ভবনের পুর্বধারের ছাদের কার্ণিসে মোটা পাতার সুন্দর নাদুসনুদুস এ বট চারা টি আমার চোখে পড়ে। সিদ্ধান্ত নেই, এটিকে তুলে নিয়ে তিনদোকানের রাস্তার পাশে লাগাবো। দু'টি পরিত্যক্ত বাঁশ খাড়াখাড়ি দাঁড় করিয়ে মিনালকে উঠিয়ে দিলাম। মিনাল ঠিকই টেনে তুলে ফেলল।
আমরা
চারাটি সন্ধ্যায় লাগিয়ে দিলাম। কিছু ডালপালা এনে
চারদিক বেড়াও দিয়ে দিলাম, এ
চারাটি কিছুটা বড় হলে এর
পাশে অরুন ওরা কয়েকজনে
মিলে একটি চিকনপাতার পাকুড়
গাছের চারা লাগিয়ে দেয়।
এটিই এখন তিন দোকানের
ছায়াদানকারী বটবৃক্ষ। দুই বছর আগে
প্রচন্ড ঘুর্ণিবাত্যায় বটগাছটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখন আবার
আগের রুপে দাঁড়িয়ে আছে ।
লেখক-আব্দুর রশীদ খান