সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯ | | ২২ রমজান ১৪৪০
banner

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেবার অপেক্ষায় বিয়ানীবাজারের দুই শতাধিক তরুণ

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০৬:০০ পিএম

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেবার অপেক্ষায় বিয়ানীবাজারের দুই শতাধিক তরুণ

সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্য গমণ প্রায় বন্ধ থাকায় যে কোনো মূল্যে ইউরোপে যেতে চায় সিলেটের তরুণরা। এই জেলার মধ্যে আবার বিয়ানীবাজারের তরুণরা এই পথে পা বাড়ায় বেশি। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে হলেও জীবন সাজাতে তাদের কোন ভয় নেই। এখানকার তরুণদের মনে-ইউরোপ মানে বিলাসী জীবন, সংসারের সুখ-শান্তি। এই শান্তির পেছনে ছুটতে গিয়ে লিবিয়া হয়ে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে এখনো নিখোঁজ বিয়ানীবাজারের ৪ তরুণ। এই ৪ তরুণ ছাড়াও গত বছর থেকে ভূমধ্যসাগরে বিয়ানীবাজারের প্রায় ৫০ জন তরুণ নিখোঁজ রয়েছে। তবে সন্তান নিখোঁজের ঘটনায় তাদের পরিবারের কোন সদস্য সহজে মুখ খুলতে চায় না। পরিবারের উজ্জল-উচ্ছল সন্তান অনিশ্চিত জীবনের মুখামুখি থাকলেও খোদ বাবা-মা’ই নীরব-নিস্তব্দ। তবে এই নৌকাডুবির পর থেকে বিয়ানীবাজারের কয়েকজন আদম ব্যবসায়ীরা পলাতক রয়েছেন। 


নিখোঁজদের মধ্য উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের মাইজকাপন গ্রামের মৃত মাহমদ আলীর পুত্র আব্দুল হালিম সুজন (৩২) ও চারখাই ইউনিয়নের আদিনাবাদ গ্রামের দুদু মিয়ার পুত্র সুয়েব আহমদ তুহিন (২৮), রফিক আহমদ ও রিপন আহমদ নামের আরো দুই যুবক। তবে উপজেলার কোন এলাকায় তাদের বাড়ি এ বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


নিখোঁজ সুজনের বড়ভাই আব্দুল আলিম জানান, সুজন দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। মা-বাবাহীন পরিবারের চার ভাই ও এক বোনের সংসারের হাল ধরতে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল। পার্শ্ববর্তী বড়লেখা উপজেলার গোয়ালি গ্রামের শাহিন আহমদ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার এলাকার পারভেজ আহমদ নামের এক দালালের সাথে ৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রায় ১ বছর পূর্বে ইটালি যাবার জন্য চুক্তি হয়েছিল। দীর্ঘদিন লিবিয়াতে অবস্থান করার পর গত বৃহস্পতিবার (৯ মে) সমুদ্র পথে ইটালি যাওয়ার জন্য ট্রলারে চড়ে সেসহ আরো কয়েকজন। ট্রলারে চড়ার পূর্বে সুজন বাড়িতে সর্বশেষ যোগাযোগ করেছে বলে জানান তার ভাই আব্দুল আলিম। নৌকাডুবির ঘটনা জানার পর থেকে আমার পরিবার-পরিজনদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। কেননা ট্রলারে চড়ার পর থেকে এখনো বাড়িতে সে যোগাযোগ করেনি। ভাইয়ের খোঁজ নেয়ার জন্য দালালের সাথে সর্বশেষ যোগাযোগ করলে পারভেজ নামের ওই আদম ব্যবসায়ী জানান, আমরা সুজনকে ইটালিগামি ট্রলারে তুলে দিয়েছি। 


নাম প্রকাশে শর্তে এক আদম ব্যবসায়ীর জানা যায়, বর্তমানে লিবিয়া উপকূলে ইতালি পাড়ি দেবার অপেক্ষায় বিয়ানীবাজারের প্রায় দুইশত যুবক রয়েছে। সময়-সুযোগ বুঝে তাদের সাগরে ট্রলারে তুলে দেয়া হবে। যারা ঢাকা ও চট্রগ্রাম বিমানবন্দর থেকে কয়েকটি দেশ ঘুর লিবিয়ায় পৌঁছে। লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছতে তাদের একেকজনকে সাড়ে ৬ লাখ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। লিবিয়া গিয়ে সাগর পাড়ি দিতে আরো ২ লাখ টাকা করে দিলে তাদের ইতালিতে পৌঁছে দেয়া হয়। সাগর উত্তাল থাকায় এখন মাঝে মধ্যে নৌকাডুবে। তিনি আরো জানান, তার মাধ্যমে সিলেট বিভাগের প্রায় ৩ শতাধিক তরুণ ইতালিতে পাড়ি দিয়েছেন। তবে এখন লিবিয়া তার লোক নেই। ঝুঁকি রোটের কারণে তিনি এখন এই পথে লোক পাঠাচ্ছেন না। 


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে পৌরসভার ফতেহপুর গ্রামের ইমন (২২), শ্রীধরার ফরিদুল আলম (২৪) ও খাসা গ্রামের ইমরান (৩০) এছাড়াও বৈরাগীবাজার এলাকার লাকি মিয়ার পুত্র পলাশ আহমদ, চুনু মিয়া পুত্র জাহিদ হাসান, মনাই মিয়ার পুত্র শাখাওয়াত হোসেন, সাইদুল হকের পুত্র এবাদুল হক, আজির উদ্দিনের পুত্র জিয়া উদ্দিন, এমদাদুল হকের পুত্র জাকারিয়া আহমদ ও সাইদুর রহমানের পুত্র আবু তাহের গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে লিবিয়াতে নিখোঁজ রয়েছে। বৈরাগী বাজার এলাকার ওই ৭ তরুণের পবিরারের সাথে একাধিক বাার যোগযোগের চেষ্ঠা করার হলে তার পরিবারের কেউ মূখ খুলতে চায় না। 


তবে স্থানীয় লোকজনের কাছে তাদের পরিবারের মুখ না খোলার কারণ জানতে চাই তারা বলেন, বৈরাগী বাজার এলাকায় এক পরিবারের ২-৩ করে এই পথে পাড়ি দিয়েছেন। আদম ব্যবসায়ীরা ওই সব পরিবারের ১ জন করে ইতালিতে পাড়ি দিত। ওই পরিবারের ১ জন সদস্য ইতালি পৌঁছার পর যদি টাকা দিতে অস্বীকার বা টাকা কম দিতে চায় তাহলে তার অন্য সহোধরকে লিবিয়াতে নির্যাতন করে টাকা আদায় করে আদম ব্যবসায়ীরা। তাই ভুক্তভোগী পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না।


লিবিয়া হয়ে ইতালি পাড়ি দেয়া বিয়ানীবাজারের তরুণ আশরাফ আহমদ জানান, গত বছরের এপ্রিল মাসে তিনি ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়িতে থেকে বেরিয়েছিলেন। দুই মাস লিবিয়াতে থাকার পর তিনি ইতালি পাড়ি দিয়েছেন। সে পাড়ি দিবার সময় তাদের ট্রলারটি ডুবে গিয়েছিল। সে সময় ইতালির কোস্টগার্ড এসে তাদের উদ্বার করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তিনি আরো জানান, তার সাথে থাকার অনেকে সাগরে ডুবে মারা গিয়েছে। কেউ কাউক বাচানো চেষ্টাও করেনি। সাগরের বরফ শীতল পানি শরীরে লাগার পর মনে হয় বেল্ট দিয়ে যেন কেউ শরীরে টান দিচ্ছে। 


বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অবণী শংকর কর তরুণদের বাড়ি ঘুরে এসে জানান, গত ৯ মে সুহেব আহমদ তুহিন তার পরিবারের সদস্যদের সাথে শেষ যোগাযোগ করে। এরপর থেকে সে নিখোঁজ হয়। অপরদিকে একইপথে ইটালি যেতে নিখোঁজ হয়েছে আব্দুল হালিম সুজন, রফিক আহমদ ও রিপন আহমদ নামের আরো তিন যুবক।


তিনি আরো বলেন, সাগরে জীবনহানীর জন্য যারা প্রলোভন দেখিয়েছে, সেসব আদম ব্যবসায়ীদের কোন ছাড় দেয়া হবেনা। কোন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মামলা দায়ের করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানু ব্যবস্থা নেয়া হবে।


সর্বশেষ সংবাদ