সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯ | | ২২ রমজান ১৪৪০
banner

শ্রীপুর ভূমি অফিস: যেখানে দূর্নিতী'ই নীতি,অনিয়মই নিয়ম

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯, ০৫:৪৬ পিএম

 শ্রীপুর ভূমি অফিস: যেখানে দূর্নিতী'ই নীতি,অনিয়মই নিয়ম

আরিফ প্রধান, শ্রীপুর-গাজীপুর :মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দূর্নিতীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও, মাননীয় ভূমিমন্ত্রী  দূর্নিতী প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পৃক্ত সারা দেশের কর্মকর্তা কর্মচারিদের সম্পদের হিসাব নিলেও, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বিভিন্ন সভা সেমিনারে দূর্নিতী বিরোধী বক্তব্য দিলেও,

গাজীপুর ০৩( শ্রীপুর) আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন সবুজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে শ্রীপুরের সকল সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক করলেও, কাওকে দূর্নিতী অনিয়ম করতে দেওয়া হবেনা, করলে কাওকে ছাড় দেওয়া হবেনা বলে কঠিন হুঁশিয়ারি দিলেও। গাজীপুরের শ্রীপুর ভূমি অফিসে থেমে নেই দূর্নিতী অনিয়ম আর জালিয়াতি।

কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই এখানে চলছে দূর্নিতীর মহোৎসব। যে যেভাবে পারছে দেদার্ছে করে যাচ্ছে অনিয়ম আর দূর্নিতী। অফিসগুলোতে তৈরি করেছে কর্মকর্তা কর্মচারি, দালালদের সমন্বয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যার ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন, ক্ষুন্ন হচ্ছে সরকারের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। হয়রানি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারন জনগনের, গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।

শ্রীপুরের ভূমি অফিসগুলোতে অতিরিক্ত টাকা (ঘুষ) ছাড়া কোন কাজই হয়না। অফিসের দেয়ালে দৃষ্টিনন্দন সিটিজেন চার্টার (সাইনবোর্ড) থাকলেও বাস্তবে তার  সাথে কোন মিল নেই। নামজারী (খারিজ) করার জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ১১৫০/- এক হাজার একশত পঞ্চাশ টাকা। যা (ডেসিয়ারের) ডুপ্লিকেট কার্বন কপি সংগ্রহ করার সময় রশিদের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। আর সাথে বিশ টাকার কোর্ট ফি। কিন্তু এই অফিসের নিয়ম নিতী ভিন্ন।

এখানে নামজারী করতে গেলে সরকারি ফি ১১৫০/- টাকা ছাড়াও আপনাকে আরও ৪৫০০/ চার হাজার পাচশত টাকা দিতে হবে,যদি জমির পরিমান কম হয়। আর যদি জমির পরিমান এক একর পরিমান হয় তাহলে ৮ হাজার পাচঁশত টাকা, আর তার উপরে হলে, জমির ধরন ,ব্যক্তি বিশেষ কয়েক লাখ টাকাও হতে পারে। আর নথি জমা দেওয়ার সময়ত ১ শতটাকা থেকে পাঁচশত টাকা দিতেই হবে। তাও আবার যদি কোন ধরনের ছোট খাটো ভূল মুদ্রাজনিত, টাইপ  ইত্যাদি থাকে তাহলেতো কোন কথায় নেই ঘুষের অঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

আর সময়ের ক্ষেত্রে সাইনবোর্ডে ২১ থেকে ৩০ দিন লেখা থাকলেও বাস্তবে তা কয়েক মাসও লেগে যায়। আবেদন জমা দেওয়ার সময় যে স্লিপ, (রশিদ) দেয় তার মধ্যে কোন সিল, সাক্ষর, তারিখ কিছুই থাকেনা। তারা পিছনের তারিখে সাক্ষর করে। যাতে কেও কিছু বুজতে, বা বলতে না পারে। আর হয়রানির কথা সেটা নিউজে বলে বুজানো যাবেনা। আজ নয় আগামীকাল আসেন, পরশু আসেন।এখনও হয় নাই, সাক্ষর বাকি আগামী সপ্তাহে আসেন ইত্যাদি।

দূর্নিতী আর অনিয়ম এখানে এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে, কেও যদি সরকারি নিয়মনিতীর কথা বলে এটা তাদের কাছে অনিয়মের মত মনে হয়। আর সাধারণ মানুষ জানেইনা যে তারা এটা অতিরিক্ত টাকা ঘুষ হিসেবে দিচ্ছে। তারা মনে করে এটা মনে হয় সরকারি ফি। আর তাদের ধারনাও এটাইযে টাকা ছাড়া খারিজ করা যায় না, তাই আগে টাকা যোগাড় করে পড়ে নামজারীর জন্য অফিসে আসে। অফিসে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সময় এক দালাল এগিয়ে এসে বলেন, অফিসে কোন ঘুষের লেনদেন হয়না, তখন তার কাছে অফিসের নির্ধারিত ঘুষের টাকার  কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই টাকাতো অফিসের রেইট, এই টাকা দিতেই হবে। এটা ঘুষ নয়। এটা অফিসের নির্ধারিত টাকা। একটা সরকারি অফিস কতটুকু দূর্নুিতীগ্রস্থ হলে অফিসের একজন দালাল বুজতেই পারেনা,কোনটা ঘুষের টাকা আর কোনটা সরকার নির্ধারিত ফি।

তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা যায়, জমির পরিমান কম একটি নামজারীর জন্য অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারি দালাল তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে শ্রেনীবেধে ১০, ১২ ১৫  হাজার ( উপরে যত হতে পারে) টাকা নিয়ে থাকে, এইটাকা থেকে তাদেরকেও আবার চার হাজার পাচশত টাকা ঘুষ হিসেবে দুই অফিসে জমা দিতে হয়। দুই হাজার টাকা উপজেলা ভূমি অফিসে, আর প্রস্তাব পাঠানোর   

আর দুই হাজার টাকা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে, আর ৫ শত টাকা নোটিশ জারির জন্য দিতে হয়। এই টাকা দেওয়ার পরে বাকি টাকা ঐ কর্মকর্তা, কর্মচারি, বা দালালের পকেটে যায়। অফিস এই টাকা তাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছে। টাকাটা হলো সরকারি ফি 'র টাকার মত, বাধ্যতামূলক দিতেই হবে। এই ঘুষের টাকাকে অফিস রেইট ' অফিস খরচ 'নামে অভিহিত করা হয়।

অফিসের একজন বলেন আমার নিজের জমি খারিজ করাইতেও অফিস রেইটের টাকা জমা দিয়া করতে হয়েছে।

অফিসের একজনের সাথে ৬ শতাংশ জমির নামজারীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন দুই অফিস মিলায়াইয়া ৬ হাজার টাকা লাগবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আমার কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা খাইবেন? তিনি বলেন এটা শুধুমাত্র আপনার জন্য। অন্য কেও হলে আরও অনেক বেশি চাইতাম। আমাদের অফিসের একটা রেইট নির্ধারিত করা আছে। আমি কি আপনার কাছে বেশি টাকা চাইতে পারি। মনে হচ্ছে এটা সরকারি টাকা চাইছে।

ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা ভাংনাহাটি গ্রামের একজনের কাছে  জানতে চাইলে তিনি বলেন, নামজারীর জন্য আমাকে ১১হাজার টাকা দিতে হয়েছে, তাও আবার কত হয়রানি। তেলিহাটি থেকে শ্রীপুর ভুমি অফিসে সেবা নিতে আসা ৭০ বছরের একজন বৃদ্ধ   দুঃখ করে বলেন, আমার একটি নামজারীর আবেদনের মধ্যে বাট্টা দাগ থাকার পরেও তারা বাট্টা দাগ না দেওয়ার কারনে আমি এই নামজারী কোন কাজেই ব্যাবহার করতে পারছিনা। এটাতো তাদের ভুল, আমার তো কোন ভূল নেই। তারপরও এখন সংশোধনের জন্য ৬ হাজার টাকাও দিয়েও প্রায় ছয় মাস যাবৎ ঘুরছি, আজকেনা কাল, কাল না পরশু বলে গুড়াচ্ছে।

অনেক অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একজনের জমি আরেকজনের নামে,এক দাগের জমি আরেক দাগে, দিতে একটু চিন্তাও করেননা। এই কারনে মিস কেইস  মোকদ্দমার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। আর এক জন আরেকজনের সাথে জমি নিয়ে জড়িয়ে পরছে ঝগড়া বিবাদে আর সংঘর্ষে। বিচ্ছিন্ন হচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন।

মিস কেইস মোকদ্দমার ক্ষেতে অনুর্ধ ৯০ দিনের মদ্ধে বিরোধ নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে তা কয়েক বছরও লেগে যায়।

রাজাবাড়ি থেকে সেবা নিতে আসা একজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনিে বলেন আমার একটি মিস মোকদ্দমা চলছে।প্রায় তিন বৎসর যাবৎ গুড়ছি এখনও পর্যন্ত কোন সুরাহাই হচ্ছেনা। সমাধানের কোন পথই দেখছিনা। অনুর্ধ ৯০ দিনের মদ্ধে বিরোধ নিষ্পত্তির কথা থাকলেও আশ্চর্যজনক এটাই তারা শুনানির জন্য  হাজিরার দিন ধার্য করে ৩ মাস ৪ মাস পড় পড়। আসলে বিভিন্ন কিছু বুজিয়ে শুনানি নাকরে আবার ৩, মাস ৪ মাস পড় তারিখ দিয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে আমাকে  গুড়াচ্ছে। আমার কথা হলো আমার কাগজপত্র যদি ঠিক থাকে তাহলেতো আমার পক্ষে রায় আসবে, আর যদি প্রতিপক্ষের কাগজপত্র ঠিক থাকে তাহলে তাদেরকে তো রায় দিবে। এভাবে দিনের পর দিন গুরিয়ে আমাদের মত দরিদ্র মানুষের সময় ও অর্থ নষ্ট করার কি দরকার আছে। ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা কর্মচারি নামে বেনামে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। সঠিকভাবে তাদের সম্পদের হিসাব নিলে বেড়িয়ে আসবে থলের বিড়াল।

আগামী পর্বে আরও কিছু  গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হবে চোখ রাখুন।

সর্বশেষ সংবাদ