সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯ | | ২২ রমজান ১৪৪০
banner

মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার আগে

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৯, ০৩:১৪ পিএম

মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার আগে

মঙ্গলগ্রহে যাওয়া নিয়ে মহাকাশবিজ্ঞানীদের মহা তোড়জোড়। কিন্তু এ তো আর সহজ ব্যাপার নয়। সেখানে যেতে যেসব বাধা আছে, সেগুলো আগে দূর করতে হবে। গবেষকেরা বলছেন, মঙ্গলযাত্রায় কিছু সমস্যা আছে, যা খুব জটিল আর সূক্ষ্ম। এসব সমস্যা খুঁজে বের করে তা সমাধানে কাজ শুরু করেছেন গবেষকেরা।


ইকোনমিস্ট সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর মতো কঠিনতম এক সম্ভাবনার সামনে বিশ্ব দাঁড়িয়ে। মঙ্গলগ্রহে যেতে লাগবে ৯ মাস। ফিরে আসতে চাইলে কমপক্ষে সেখানে এক বছর অবস্থান করতে হবে। অর্থাৎ, মঙ্গল অভিযাত্রায় প্রায় তিন বছর পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না নভোচারীর। এ যাত্রায় কারিগরি সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি নভোচারীদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলোর দিকেও তাকাতে হচ্ছে গবেষকদের।


গবেষকেরা বলছেন, মঙ্গলযাত্রায় নভোচারীদের উচ্চবিকিরণের মুখে পড়ার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তাঁদের মাংসপেশির খিঁচুনির বিষয়টি। একই সঙ্গে সহযাত্রীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও চিন্তায় রয়েছে। এগুলো ঠিকঠাক না হলে নভোচারীর ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি থেকে যাবে। তবে ঠিক কোন কারণটি বেশি ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে, তা এখনই বলা কঠিন।


মঙ্গলগ্রহের মতো দূরের কোনো গ্রহে অভিযান চালানোর বৈজ্ঞানিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নাসা মঙ্গলগ্রহের নভোচারীদের শারীরিক ও মানসিক দিকগুলো ঠিক রাখার বিষয় নিয়ে কাজ করছে। এ বছর বিষয়টি নিয়ে এক সভা করেছেন আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের (এএএএস) গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ওই বৈঠক। সেখানে গবেষকেরা মঙ্গলগ্রহে যাত্রা ও বসবাস করার বিষয়ে নানা ঝুঁকির বিষয়ে তাঁদের গবেষণা তথ্য উপস্থাপন করেছেন।


ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘টুইন স্টাডি’ নামে একধরনের গবেষণা চালাচ্ছে নাসা, যেখানে অভিন্ন যমজ মহাকাশচারী মার্ক এবং স্কট কেলিকে নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে। স্কট ২০১৫ সালে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে স্টেশন কমান্ডার হিসেবে কাটিয়েছেন। একই সময় মার্ক পৃথিবীতে থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁদের রক্তের নমুনা, মূত্রসহ নানা বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা করাও হয়েছে। মহাকাশ ভ্রমণে মানুষের শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি গবেষক দল নানা রকম গবেষণা করেছে। আণবিক, ধারণাগত ও শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।


উইল কর্নেল মেডিকেল কলেজের গবেষক ক্রিস ম্যাসন গবেষকদের ওই সভায় বলেছেন, গবেষণায় প্রাপ্ত ফল দেখে তাঁরা চমকে গেছেন। মহাকাশে অবস্থানকালে স্কটের টেলোমেরেস দীর্ঘ হয়েছে। টেলোমেরেস হচ্ছে ডিএনএর তন্তু যা কোষের নিউক্লিয়াসের ক্রোমোজোমের প্রান্তে টুপি হিসেবে থাকে। কোষের যখন বয়স বাড়ে এবং তা বিভাজিত হয়, তখন সাধারণত টেলোমেরেস খাটো হয়।


গবেষক ম্যাসন স্কটের জিনের সঙ্গে পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তাঁর ভাইয়ের জিনের তুলনা করেন। স্কটের শরীরে রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত জিনকে অধিক সক্রিয় হতে দেখেছেন তিনি। গবেষক ম্যাসন বলেন, শরীর যেন অধিক সতর্ক হয়ে রয়েছে, এটা তেমনি একটি ঘটনা। মহাকাশ ভ্রমণের ধকলে যা আশ্চর্য কিছু নয়। আরেকটি বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ হলো, স্কটের রক্তে প্রচুর মাইটোকন্ড্রিয়াল টুকরার উপস্থিতি। মাইটোকন্ড্রিয়ালকে কোষের পাওয়ার হাউস বলা হয়। এটি কোষের মধ্যকার ক্ষুদ্রকাঠামো, যা চিনি থেকে শক্তি উৎপন্ন করে। যখন চাপের কারণে কোষের ক্ষতি হয় বা কোষ মারা যায়, তখন এগুলো রক্তপ্রবাহে মিশে যায়।


স্কটের ক্ষেত্রে সুখবর হচ্ছে তিনি পৃথিবীতে ফেরার পর, শরীরে যে হাজারো পরিবর্তন ঘটেছিল তা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুস্থ মানবশরীর মহাকাশ ভ্রমণের পর পূর্বাবস্থায় ফিরতে পারে। তবে এ গবেষণা মাত্র দুজনকে নিয়ে করা হয়েছে বলে এর নমুনাকে পর্যাপ্ত বলতে নারাজ গবেষকেরা। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণা করার পরিকল্পনা করছে নাসা। চাঁদে মানুষ ভ্রমণের সময় তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার প্রস্তুতিকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।


স্কট যখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ফিরে আসেন, তখন তিনি মহাকাশে সফল মিশন সম্পর্কে মন্তব্য করেন ‘দলগত কাজ করলে স্বপ্নের মতো কাজ হয়’। তবে মঙ্গলগ্রহে অভিযানের ক্ষেত্রে কীভাবে দল গঠন হবে, দলের মধ্যে যদি সমস্যা হয়, তখন কী করা হবে বা কোনো সমস্যা হলে কীভাবে সমাধান করা হবে, এসব বিষয় ঠিক করা জরুরি বলে মনে করেন গবেষকেরা।


গবেষকেরা বলেন, মঙ্গলগ্রহের মতো মিশনে কমপক্ষে ছয়জন নভোচারী যুক্ত থাকতে পারেন। একেকজন একেক সংস্কৃতির হতে পারেন। একটি বাড়ির সমান জায়গার মধ্যে তিন বছরের মতো সময় মহাকাশে তাঁদের মানিয়ে চলতে হবে। খুব জরুরি হলেও তাঁদের পালানোর কোনো পথ থাকবে না।


এ ধরনের পরিস্থিতির একটি মডেল নিয়ে কাজ করছেন ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণ বিশেষজ্ঞ নসির কনট্রাকটর। ওই সভায় তিনি বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে একদল ব্যক্তি একসঙ্গে থাকলে তাঁদের আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। টেক্সাসে জনসন স্পেস সেন্টারে তিনি পরীক্ষামূলক মহাকাশ অভিযানের অংশ হিসেবে একদল স্বেচ্ছাসেবককে ৪৫ দিন আটকে রাখেন। তাঁদের খুঁচিয়ে ও উসকানি দিয়ে দিন-রাত শারীরিক ও মানসিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়।


গবেষকেরা বলছেন, মহাকাশ অভিযানের মতো বিষয়ে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তি প্রয়োজন হবে যাঁরা দলগত কাজে সাহায্য করতে পারবেন। ভালো দল গঠন করতে গেলে একজন ভালো নেতৃত্ব দরকার। দরকার একজন সামাজিক বিষয়গুলো ঠিকভাবে সামলাতে পারেন এমন সচিব, একজন গল্পবাজ, অন্তর্মুখী ও বর্হিমুখী মানুষের সংমিশ্রণ। তবে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হাস্যরস সৃষ্টিকারী ব্যক্তি।


ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতাত্ত্বিক জেফরি জনসন দক্ষিণ গোলার্ধে অ্যান্টার্কটিকায় নিঃসঙ্গ পরিবেশে মানুষের সম্পর্কের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি মনে করেন, দল গঠনের ক্ষেত্রে ভাঁড়ের ভূমিকা শুধু হাসিঠাট্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাঁকে অনেক স্মার্ট হতে হয়। যাতে দলের প্রতিটি সদস্যকে ঠিকভাবে বুঝতে পারেন তিনি। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকায় তাঁদের মধ্যে উদ্ভূত সমস্যা বা উদ্বেগগুলো দূর করতে ভূমিকা রাখা তাঁর কাজ। মানুষের সম্পর্কের মধ্যকার সেতু হিসেবে কাজ করতে হবে তাঁকে। যে দলে হাস্যরসাত্মক ব্যক্তি নেই, তাঁদের মধ্যে লড়াই বাধে বেশি ও সম্পর্ক নষ্ট হয়।


গবেষকদের ভাষ্য, মঙ্গলগ্রহে পাঠানোর জন্য এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করতে হবে। তবে দল ভারসাম্যপূর্ণ হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা ভাবা ঠিক নয়। তাদের সঙ্গে পৃথিবীতে থাকা যে দলটি কাজ করবে, তাদের সমন্বয়টাও গুরুত্বপূর্ণ।


১৯৭৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর মার্কিন মহাকাশ স্টেশনের প্রথম দিকে স্কাইল্যাবের তিনজন মহাকাশচারী পৃথিবী থেকে পাঠানো নির্দেশ অনুসারে কাজ করতে অনীহা দেখান। তাঁরা পৃথিবী থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ওই সময়ে সংবাদপত্রে এ ঘটনাকে মহাকাশে প্রথম হরতাল বলে উল্লেখ করা হয়।


গবেষক কনট্রাকটরের দল স্কাইল্যাবের ওই ঘটনায় প্রকৃত কী সমস্যা হয়েছিল তা বের করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের কথাবার্তার ট্রান্সক্রিপ্ট বিশ্লেষণ করে নভোচারী ও পৃথিবীতে অবস্থানকারী কর্মীদের কথোপকথন বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, পৃথিবীতে যে দলটি থাকবে, তাদের সঙ্গে নভোচারীদের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলগ্রহের ভবিষ্যৎ মিশনের ক্ষেত্রে কোনো ক্রু কার সঙ্গে কী কথা বলছেন তা বিশ্লেষণ করাটাও জরুরি। কথোপকথনে তাঁদের আবেগের বিষয়টি বুঝে সাড়া দেওয়া জরুরি। এ নিয়ে একটি অ্যালগরিদম তৈরির চেষ্টা করছেন তাঁরা।


মঙ্গলগ্রহের মিশনে নভোচারীদের মধ্যে আচরণগত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। পৃথিবীর কাছাকাছি থাকলে পৃথিবী থেকে নভোচারীদের নানা পরামর্শ দেওয়া যায়। কিন্তু মঙ্গলগ্রহের মতো অধিক দূরত্বে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সময় লাগবে। তাই এ নিয়ে সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু করেছেন গবেষকেরা। তাঁরা রিয়েল টাইমে নভোচারীদের আচরণ বুঝে ডিজিটাল কাউন্সেলিং করতে পারে এমন সফটওয়্যার তৈরির কাজ করছেন।


গবেষকেরা বলছেন, নভোচারীদের দলের মধ্যে বোঝাপড়া ও আবেগ ধরতে পারা জরুরি। এ ক্ষেত্রে তাঁরা অ্যানালাইটিকস প্রয়োগ করছেন। এতে নভোচারীর আচার–আচরণগুলো স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ করা যাবে এবং প্রচলিত অনেক সমীক্ষার পরিবর্তে তা ব্যবহার করা যাবে।


কিন্তু চাইলেই কি নিখুঁত একটি দল গঠন করা সম্ভব? গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ মঙ্গল মিশনের জন্য নিখুঁত দল গঠন সহজ বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক বিষয় এখনো জানার আছে। মানুষ যদি সৌরজগতের অন্যপ্রান্তে যেতে চায়, তবে এসব আচরণের বিষয়টি বুঝতে হবে। তবেই মানুষের পক্ষে মহাকাশে সফল মিশন পরিচালনা করা যাবে।

সর্বশেষ সংবাদ