সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯ | | ২২ রমজান ১৪৪০
banner

ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় ২০ মৃত্যু!

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:১৪ এএম

ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় ২০ মৃত্যু!

চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে গত বছর ২৮ জুন গলা ব্যথার চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল শিশু রাফিদা খান রাইফাকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ২৯ জুন রাতে সেখানেই মারা যায় সে। শিশুর অভিভাবকরা অভিযোগ করেছিলেন, ভুল চিকিৎসার কারণে রাইফার মৃত্যু হয়েছে। সরকারি পর্যায়ের তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়; যা নিয়ে অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে আসে, চিকিৎসক ভুল ওষুধ দিয়েছিলেন শিশুটিকে, যা শিশুটির তখনকার পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত ছিল না। ফলে ওই ওষুধই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে শিশুটির শরীরে, যার পরিণতি ডেকে আনে মৃত্যু।


একইভাবে ঢাকার আরেকটি প্রাইভেট হাসপাতালে একই রকম ভুল ওষুধের ক্ষতির মুখে আরেক রোগীর মৃত্যুর প্রমাণ পেয়েছে সরকারেরই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধের ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়া নিরূপণ কমিটি। ওই কমিটির কাছে গত এক বছরে ওষুধের ক্ষতিরকারক প্রতিক্রিয়ায় মোট ২০টি মৃত্যুর তথ্য এলেও এখন পর্যন্ত ওই দুটি ঘটনার প্রমাণ নিশ্চিত হয়েছে। বাকিগুলোর অনুসন্ধান চলছে।


আবার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে উম্মে কুলসুম নামের এক রোগী চোখের ছানি অপারেশন করার কয়েক দিন পর রুটিন চেক আপ করাতে এলে একটি ড্রপ দেওয়ার পর তাঁর একটি চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, ওই ওষুধ হয়তো ভুল ছিল বা নষ্ট ছিল বলেই এই সর্বনাশ হয়ে গেছে। কেবল এই একটি-দুটি ঘটনাই নয়, সারা দেশেই প্রতিদিন একাধিক এমন ঘটনার শিকার হচ্ছে কেউ না কেউ।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ওপর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার শিকার হওয়ার অনেক চিত্র। অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান গত শুক্রবার বাংলাদেশের ওষুধশিল্পসংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে ওই তথ্যসংবলিত একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে ওই প্রবন্ধের তথ্যে জানানো হয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ১১.৯ শতাংশ রোগী এই হাসপাতালে আসার আগে ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে। একইভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে বহির্বিভাগে আসা রোগীদের ৩.৭৫ শতাংশ এবং ভর্তি রোগীদের ৩.৪০ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়ে। গবেষণা ফলাফলে আরো বলা হয়, ক্ষতিকারক ওষুধ সেবন বা ব্যবহার চলতে থাকলে এর ক্ষতি করার মাত্রা ১.১৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে।


অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান বলেন, রোগীরা যখন বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিল, গবেষণাকালে তাদের করা প্রশ্নের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, আগে ওই রোগী এমন কোনো না কোনো ওষুধ সেবন করেছে যা তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে। কারো হয়তো সেই ওষুধ প্রয়োজন ছিল না, কারো বা ওই ওষুধ শরীরে সহনশীল নয়, কারো হয়তো অন্য কোনো একাধিক ওষুধের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটেছিল। তিনি জানান, সবচেয়ে সমস্যা বেশি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক আর ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষেত্রে।


তিনি বলেন, সব ওষুধেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে। তবে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহনীয় বা মেনে নিতেই হবে। আর কিছু ওষুধ চিকিৎসকের ভুল বা যথেষ্ট দক্ষতার অভাবে, নার্সদের অসাবধানতা, ফার্মাসিস্ট বা বিক্রেতার অসতর্কতা এবং সর্বোপরি রোগী বা ভোক্তার অসচেতনতার কারণে বড় ক্ষতি বয়ে আনে। তাই যার যার ক্ষেত্রে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। নয়তো মানুষের জীবন রক্ষার ওষুধই আবার মানুষের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।


শুধু অ্যালোপেথিক ওষুধই নয়, আয়ুর্বেদিক, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথিসহ অন্যান্য ওষুধের ক্ষেত্রেও এমন ঘটে থাকে। এমনকি অনেকে একই সঙ্গে নানা পদ্ধতির চিকিৎসা নেয় বা ওষুধ সেব করেন, যা তার শরীরের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল বলেন, ‘বেশির ভাগ ওষুধেরই ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে মানুষের লিভারের ওপর। মানুষ কথায় কথায় যেভাবে ব্যথানাশক ওষুধ নেয়, এক শ্রেণির চিকিৎসকও যে হারে ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে থাকেন, তা বিপদ বয়ে আনছে। এ ছাড়া কবিরাজি-লতাপাতার ব্যবহার এখনো আমাদের গ্রামবাংলা এমনকি শহরেও প্রচলন রয়েছে। এগুলোও খুবই ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। এসব ব্যাপারে রোগী থেকে শুরু করে সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক হতে হবে।’


অন্যদিকে বাংলাদেশে ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা অনেকে গোপনও করছে। নিরূপণ কার্যক্রমের আওতায় সরকারের উদ্যোগে দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ-হাসপাতালে পাঠানো চিঠির নির্দিষ্ট ফরমের মৃত্যুর ঘরটি অনেক ক্ষেত্রেই থাকছে ফাঁকা। ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নিরূপণ বিষয়ে কর্মরত একজন বিশেষজ্ঞ নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, মৃত্যুর ঘরটি খালি থাকার নেপথ্যে এক শ্রেণির ওষুধ কম্পানির ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে কোথাও ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় কেউ আক্রান্ত হওয়ার খবর পেলেই ওষুধ কম্পানির লোকজন ছুটে যায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে। সেখানে তাদের নানামুখী চেষ্টা চলে; প্রথমত, তাদের কম্পানির ওষুধের কারণে রোগীর ক্ষতি হয়েছে তা যেন ওই চিকিৎসক চেপে যান এবং বিষয়টি যেন ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া (অ্যাডভার্স ড্রাগ রি-অ্যাকশন-এডিআর) রিপোর্টিং সিস্টেমে উল্লেখ না করা হয়। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের একই ধরনের তৎপরতায় ফাঁকা থেকে যায় এডিআর ফরমের মৃত্যুর ছকটি।


জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, ‘এডিআর বা ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এখনো আমাদের দেশে খুব জোরালো কাজ শুরু করা যায়নি। গত চার-পাঁচ বছরে যতটা পারা গেছে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবু আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। অনেকে এখনো বিষয়টি বুঝতে পারছে না। আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এ বিষয়ে চিকিৎসক, নার্স, ভোক্তা, বিক্রেতা, প্রস্তুতকারী—সবার মধ্যেই সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’


ওই কর্মকর্তা বলেন, চিকিৎসকরা সচেতন হলে কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। আবার ভোক্তাদেরও সচেতন থাকতে হবে; তারা কোনো ওষুধ সেবন বা গ্রহণের পর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনুভব করলে দেরি না করে যেন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। আবার চিকিৎসক যাতে বিষয়টি এডিআর মনিটরিং সেলকে অবহিত করেন।


আকতার হোসেন জানান, ‘গত এক বছরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এডিআর মনিটরিং সেলে ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়াসংক্রান্ত মোট ৬৬৫টি তথ্য জমা পড়েছে। এ ছাড়া ২০টি মৃত্যুর তথ্যও এসেছে। আমরা ওই মৃত্যুর তথ্যের মধ্যে এ পর্যন্ত কেবলমাত্র দুটির ব্যাপারে প্রমাণ পেয়েছি। বাকিগুলো নিয়ে কাজ চলছে।


সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অ্যাডভার্স ড্রাগ রি-অ্যাকশন মনিটরিং ব্যবস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, জানুয়ারি ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত এক হিসাবে—ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তিনজনের মৃত্যু, ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, ছয়জন স্থায়ীভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতির শিকার হয়েছে, সাতজন অল্পের জন্য মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছে, পাঁচজন শিকার হয়েছে জন্মগত ত্রুটির, ১৪ জন রক্ষা পেয়েছে মারাত্মক কোনো ক্ষতি থেকে।


এদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে দেশে প্রথমবারের মতো একটি ফার্মাকোভিজিল্যান্স কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ওই কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা দায়ী করেছেন চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের অনৈতিক চর্চাকে, ৪৬.৬ শতাংশ দায়ী করেছেন অবৈধ উৎস থেকে ওষুধ বিতরণ বা ক্রয়কে, প্রেসক্রিপশনে একসঙ্গে অনেক ওষুধ লেখাকে দায়ী করেছেন ৪৪.২ শতাংশ এবং ৪০.৭ শতাংশ দায়ী করেছেন সেলফ মেডিকেশনকে। একই জরিপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ফার্মাকোভিজিল্যান্স ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে ৭১.৪ শতাংশ বলেছেন শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির কথা, ৬৪.৩ শতাংশ বলেছেন ল্যাবরেটরি কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা এবং হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের কথা বলেছেন ৪৫.৬ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছরের জানুয়ারির এক প্রতিবেদন অনুসারে বিভিন্ন কম্পানির মোট ৪৫টি ব্র্যান্ডের ওষুধের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার তথ্য পেয়েছিল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। পরে নির্দিষ্ট কমিটির মাধ্যমে এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ২২টি ওষুধের ডোজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং ৩২টি ওষুধের ডোজ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

সর্বশেষ সংবাদ