১৫, সেপ্টেম্বর, ২০১৯, রোববার

দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ওদের

বোমার স্প্লিন্টারে কেউ হারিয়েছেন চোখ, কারো গেছে চলার ক্ষমতা, কেউ হারিয়েছেন শ্রবণশক্তি, আবার কারো সারাজীবনের সঙ্গী হয়েছে অসহ্য যন্ত্রণা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহত আওয়ামী লীগের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় এবং সেই ভয়াল স্মৃতির কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না তারা।

সেদিনের পরে আহতদের অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কেউ কেউ শরীরে বহন করে চলেছেন শত শত স্প্লিন্টার। অনেককেই আংশিক পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। নিয়মিত চিকিত্সার মধ্য দিয়ে যন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করছেন তারা।

১৫ বছর আগের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আহত অধিকাংশ নেতাকর্মীর অনুভূতি প্রায় একই রকম। ইত্তেফাকের কাছে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে আহতরা জানান, মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফেরা সে এক ভয়ংকর দিন। গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন মানুষের দেহ আর রক্তস্রোতের বিভীষিকা। চোখের সামনে ঝরে পড়ল ২৪টি তাজা প্রাণ। হিংস্র শ্বাপদের ভয়ংকর ছোবল থেকে প্রাণটা বাঁচলেও মরণঘাতী গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণাদগ্ধ অভিশাপ নিয়েই চলছে জীবন। জীবিত থেকেও তারা যেন মৃত। ঘটনার পর তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া আর্থিক সহায়তায় অনেকেই চিকিত্সা নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এখনো নানাভাবে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।

দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ওদের

অনেকে প্যারালাইজড হয়ে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করছেন, অনেকের জীবনে এখন ক্র্যাচই নিত্যসঙ্গী। গ্রেনেড হামলায় আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর এই দিনটি এলেই আঁতকে ওঠেন তারা, সেই নৃশংস হামলার স্মৃতি কারোরই ভোলার নয়। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ১ হাজার ৮০০ স্প্লিন্টার দেহের মধ্যে নিয়ে বেঁচে আছেন মাহবুবা পারভীন। মাহবুবা জানান, মাথার দুটি স্প্লিন্টার তাকে খুব জ্বালায়। সুঁইয়ের মতো হুল ফোটায়। যন্ত্রণা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন হাসপাতালে ছোটেন। মাঝেমধ্যে তিনি পাগলের মতো চিত্কার করে আবোল-তাবোল বলেন। অর্থের অভাবে বন্ধ রয়েছে চিকিত্সা। মাহবুবার দুই চোখের চারপাশে ফোসকা পড়া। ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক এই মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা জানালেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ওষুধ খাওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পান। আর প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে লভ্যাংশ আসে, তা দিয়েই চলে তার সংসারের খরচ। এছাড়া মিরপুরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৪০০ স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাট।

২১ আগস্ট শেখ হাসিনা যে ট্রাকে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, সেই ট্রাকের পেছনে ছিলেন পুরান ঢাকার মাজেদ সরদার রোডের বাসিন্দা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেত্রী রাশিদা আক্তার রুমা। গ্রেনেডের আঘাতে ১৮টি দাঁত পড়ে যায় তার। ডান পা পচতে পচতে হাড়ে লেগেছে। এখন পচতে শুরু করেছে বাম পা। ২০০৪ সালে রাশিদা আক্তার ছিলেন ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। তবে এত যন্ত্রণার মধ্যেও তার একমাত্র শান্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের খোঁজ-খবর নেন। একটা ফ্ল্যাট দিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের জন্য আর্থিক অনুদান দিয়েছেন।

ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে রাশিদা আক্তার রুমা বলেন, ‘মৃত্যু-রক্তস্রোতের সেই ভয়ংকর সামৃতি আজো আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। পঙ্গুত্বের জীবন যে কী কষ্টের, কী যে ভয়াবহ, সে কথা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুমানও করতে পারে না। বিভীষিকাময় সেই ভয়াল দিনের কথা মনে হলে এখনো আঁতকে উঠি। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলছে আমাদের নিত্যজীবন।’

বর্বরোচিত সেই গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য এস এম কামাল হোসেনও সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে হলেই আঁতকে ওঠেন। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এখনো ১০ থেকে ১২টি স্প্লিন্টার শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

ছেলে হত্যার বিচার চান মা

খোকসা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অন্যদের মধ্যে মারা যান কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামের হারুন-অর-রশিদের সন্তান মাহাবুবুর রহমান মাসুদ। তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের একজন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাহবুব তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন একনিষ্ঠভাবে।

মাহাবুবের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। এই সরকারের ১১ বছর চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমার ছেলে হত্যার বিচার হলো না।’ মাহাবুবের বাবা হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই, বিচার হলে আমি মরেও শান্তি পেতাম।’ তিনি মাহাবুবের নামে একটি রাস্তা ও কবরের চারপাশে প্রাচীরের দাবি করেন।

মতামত