১৬, অক্টোবর, ২০১৯, বুধবার

সেলিমের ভিডিও ফাঁদে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা

গুলশান ২-এর ৯৯ নম্বর সড়কের ১১/১ নম্বর বাসার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া করে ‘রংমহল’ বানিয়েছিলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘থাই ডন’ হিসেবে পরিচিত সেলিম প্রধান। সপ্তাহের প্রতি শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সারারাত সেখানে ‘জলসা’ হতো। সেই জলসায় যাতায়াত ছিল একাধিক প্রভাবশালী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারও। সেখানে নিয়মিত যেতেন সাবেক দুই প্রতিমন্ত্রীও। জলসায় অংশগ্রহণকারীদের অনৈতিক ও অসংযত জীবনাচরণের ছবি ধারণ করতে বসানো ছিল গোপন ক্যামেরা। সেই ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও মেমোরি কার্ডে নিয়ে রাখতেন সেলিম। পরে ওই ছবি দেখিয়ে ভিআইপিদের ফাঁসানোর ফাঁদ পাতেন তিনি। সেলিমের ঘনিষ্ঠজন ছাড়াও একাধিক দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর সেলিম প্রধানের অপরাধ জগতের অনেক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সেলিম প্রধান গত ৩০ সেপ্টেম্বর থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে বিদেশ যাওয়ার সময় তার লাগেজের সঙ্গে অনেক মালপত্র নিয়ে যাচ্ছিলেন। লাগেজ তল্লাশি করে পাওয়া যায় তিনটি মেমোরি কার্ড। পরে ওই কার্ড পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে দেশি-বিদেশি তরুণীদের সঙ্গে অনেক ভিআইপির অন্তরঙ্গ ছবি। জিজ্ঞাসাবাদে জানতে চাওয়া হয়, কেন ওই মেমোরি কার্ড থাইল্যান্ডে নিয়ে যাচ্ছিলেন- এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি সেলিম। তবে গোয়েন্দারা বলছেন, এসব ভিডিও দেখিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল সেলিম প্রধানের। বিদেশে বসে ভিআইপিদের গোপন ভিডিও প্রচার ও প্রকাশের কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।

এরই মধ্যে অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধানসহ তিনজনকে মা’দক মামলায় চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর আদালতের হাকিম মইনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার দুপুরে এ আদেশ দেন। অন্য দুই আসামি হলেন- আখতারুজ্জামান ও রোমান। সেলিমের আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে খোঁজা হচ্ছে। তাদের মধ্যে একাধিক দেশি-বিদেশি নারীও আছেন।

দীর্ঘদিন ধরে সেলিমের কর্মকাণ্ডের তথ্য রাখেন এমন একাধিক ব্যবসায়ী ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গুলশান-২ নম্বর সেকশনের একটি বাড়ির দুটি ফ্লোর ভাড়া নিয়েছিলেন সেলিম প্রধান। ওই বাড়ির

তৃতীয় তলায় এক বাঙালি স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। চতুর্থ তলায় ছিল তার রংমহল। সেখানে পাঁচটি বড় বড় কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি কক্ষে তার অফিস সহকারীরা বসতেন। বাকি তিনটি রুম নাচ-গান ও ভিআইপিদের মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহার হতো। একটি বিশেষ কক্ষে ভেন্টিলেটরের ওপর ছোট্ট গোপন ক্যামেরা বসানো থাকত। দেশি-বিদেশি সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর মুহূর্তগুলো ওই ক্যামেরায় ধারণ করা হতো। সেলিম প্রধানের নির্দেশে মাসুম নামে এক যুবক ওই কক্ষে এই গোপন ক্যামেরা বসায় বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, সেলিম প্রধানের কাছে বাড়িওয়ালা ভাড়া বাবদ পাবেন ২৬ লাখ টাকা। প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে সেলিম সেই ভাড়া দিচ্ছেন না। এ বাড়িতে প্রভাবশালীদের আনাগোনা থাকার বিষয়টি জানতেন বাড়িওয়ালা। সেলিম প্রধানকে অনেক ‘ক্ষমতাধর’ মনে করে সাহস করে কিছু বলতেন না বাড়িওয়ালা।

জানা গেছে, এরই মধ্যে সেলিম প্রধান তার গোপন ক্যামেরায় যাদের ছবি ধারণ করে রেখেছিলেন তাদের মধ্যে একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন। যাদের কেউ কেউ সাবেক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও শিল্পপতিদের ফাঁসানোর সব আয়োজন ছিল তার।

গোয়েন্দারা বলছেন, সেলিম প্রধান একজন বহুরূপী প্রতারক। সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে তার গভীর সখ্য ছিল। অনেক সময় বড় বড় প্রতিষ্ঠান কোনো আইনি ঝামেলায় পড়লে প্রভাবশালীদের ব্যবহার করে তা মিটমাট করে দেওয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন তিনি। তবে যারা তার রংমহলে নিয়মিত যেতেন তারা কোনোভাবে টের পাননি গোপনে তার ছবি ধারণ করে রাখা হচ্ছে।

এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সংস্থা সেলিমের সহকারী মাসুমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তিনি সেলিমের রংমহলের অনেক তথ্য দিয়েছেন। গুলশানে সেলিমের বাসা থেকে অসামাজিক কাজে ব্যবহার হতো, এরকম অনেক আলামত পাওয়া গেছে। মাসুম জানান, সেলিমের নির্দেশে বায়তুল মোকাররম মার্কেট থেকে গোপন ক্যামেরা কিনে গুলশানের বাসায় লাগানো হয়। গোপনে ভিআইপিদের ছবি ধারণ করার দায় সেলিম প্রধানের। গুলশানে তার রংমহলে যারা নিয়মিত যেতেন তাদের ‘প্রধান ক্লাবের’ সদস্য করে নিতেন সেলিম। ‘প্রধান ক্লাবে’ একবার কেউ নাম লেখালে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন ছিল। মূলত এই রংমহলের আনঅফিসিয়াল নাম ছিল প্রধান ক্লাব।

একটি জাতীয় দৈনিকের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কীভাবে ওই রংমহলে গোপন ক্যামেরা বসানো হয়েছিল তার ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন সেলিম প্রধানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী মাসুম।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মূলত অনলাইনে ক্যাসিনো গেমের আসর বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সেলিম প্রধান। শুধু এক মাসে তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে ৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে অনলাইনে জুয়া খেলার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ও ফিলিপাইনে শতকোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রথমে পি-২৪ ও এসডি কনসাল্টিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট নামে দুটি অনলাইন জুয়ার প্রতিষ্ঠান খোলেন সেলিম প্রধান। পি-২৪-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন সেলিম। একই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন অন্য এক প্রভাবশালী ব্যক্তির ভাই। এসডি কনসাল্টিংয়ের চেয়ারম্যান করা হয় উত্তর কোরিয়ার নাগরিক মি. লিকে। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়েছিল জনৈক গোলাম মাওলাকে। এসডি কনসাল্টিংয়ের নামে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ও সিটি ব্যাংকে তিনটি হিসাব খোলা ছিল। বিভিন্ন ইকোনমিক গেটওয়ের মাধ্যমে এই হিসাবগুলোতে লাখ লাখ টাকা জমা হতো; যা অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে আয় হতো। একসময় সেলিম প্রধানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় গোলাম মাওলার। তাই টি-২১ নামে আরেকটি কোম্পানি খোলেন সেলিম প্রধান। ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হয় রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা শাহনাজ পারভীন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয় মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা জনৈক জাকির হোসেন পলাশকে। শাহনাজের গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবিরহাট। তাদের বিস্তারিত পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। নেপথ্যে সেলিম প্রধানের হয়ে টি-২১ অনলাইন জুয়া খেলা পরিচালনা করতেন জনৈক আখতারুজ্জামান। তারা রাজধানীর বনানীতে একটি অফিস খুলে বসেন। ইউসিবি ব্যাংকের সামিট অ্যান্ড সবুর ব্রাদার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান ও যমুনা ব্যাংকের আলম গাজী নামে এক ব্যক্তির হিসাব নম্বরে তাদের অর্থ জমা হতো।

গোয়েন্দারা বলছেন, অত্যন্ত চতুর ও ধূর্ত ছিলেন সেলিম প্রধান। নেপথ্যে থেকে অন্যদের ব্যবহার করেই অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে টাকা পাচার করে আসছিলেন তিনি। তাকে এই কাজে সহযোগিতা করতেন চার কোরিয়ান। তারা হলেন- ডু, ইয়াং শি, লি ও জুনিয়ান লি।

জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেলিম প্রধানের জন্ম। ১২-১৩ বছর বয়সে ভাইয়ের সঙ্গে জাপান চলে যান তিনি। তার পড়াশোনা এসএসসির গণ্ডি পার হয়নি। তবে অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতেন; কিন্তু ইংরেজি লিখতে পারতেন না। জাপানে গিয়েও অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সেখানে কে-১ ফাইটিং গ্রুপ তৈরি করেন। একসময় ‘জিরো ওয়াত্তা’ নামে এক জাপানি বক্সার ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাকে বাংলাদেশেও নিয়ে এসেছিলেন সেলিম। জাপানে পাসপোর্ট নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে সেখানকার চিফ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে মারধর করেছিলেন সেলিম। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জাপানে জেলও খাটেন তিনি। এরপর জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান সেলিম। সেখানে কিছু দিন থাকার পর দেশে ফেরেন। এরপর আবার থাইল্যান্ড যান সেলিম। সেখানে তার একাধিক বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে।

সেলিম প্রধানকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন-জানেন এমন এক ব্যবসায়ী জানান, এমন কোনো খারাপ দিক নেই যেটা সেলিমের মধ্যে ছিল না। তার ডাকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হাজির হতো শত শত সুন্দরী তরুণী। একসময় সেলিম প্রধানের সঙ্গে হাওয়া ভবনের অনেকের গভীর সম্পর্ক ছিল।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সেলিমের বিয়ে নিয়েও রয়েছে চমকপ্রদ নানা কাহিনী। একসময় রাশিয়ার আনা নামে এক নারীকে বিয়ে করেন সেলিম। বর্তমানে জাপানেও তার এক স্ত্রী রয়েছে। পুরান ঢাকায় মাসুমা নামে এক নারীকেও বিয়ে করেন তিনি। তাকে নিয়েই গুলশানে থাকতেন তিনি। এ ছাড়া কাস্টমসে কর্মরত আরেক নারীকে সেলিম বিয়ে করেছেন বলে শোনা যায়। তবে প্রমাণাদি পাওয়া যায়নি। সেলিম তার সাঙ্গোপাঙ্গদের মাধ্যমে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে গরু ও মা’দক কারবারেও জড়িত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক জুয়াড়িদের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। অনেক সময় সংসদ সদস্য লেখা সংবলিত স্টিকারযুক্ত গাড়ি নিয়ে চলতেন তিনি। সিলেটের পাথর ব্যবসায়ও তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। সেলিম প্রধান রূপালী ব্যাংকের তালিকায় অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি। ব্যাংকটি বর্তমানে তার কাছে পাবে শতকোটি টাকার বেশি।

সেলিম প্রধানের প্রিন্টিংয়ের ব্যবসাও ছিল। তার ওই প্রতিষ্ঠানের নাম জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড। এই প্রেস থেকে দেশি-বিদেশি নানা ব্যাংকের চেক বই, ব্যাংক ড্রাফট ও নিরাপত্তা সামগ্রী ছাপতেন ও সরবরাহ করতেন তিনি। অন্তত ১৮টি ব্যাংকে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নামে মালপত্র সরবরাহ করেন।

সেলিম প্রধানের প্রভাব-প্রতিপত্তির ব্যাপারে এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, নারায়ণগঞ্জে সেলিম প্রধানের একটি কারখানা কিছু সরকারি জায়গা দখল করে নেয়। তার কারখানার কারণে একটি উড়াল সড়কের ডিজাইন পাল্টাতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এটা করতে তিনি সরকারঘনিষ্ঠ একজন বড় নেতার নাম ব্যবহার করেছিলেন। -সাহাদাত হোসেন পরশ, সমকাল

মতামত