১৬, অক্টোবর, ২০১৯, বুধবার

খাটাল থেকে ২০ কোটি চাঁদা নেন ক্যাসিনো সেলিম

অনলাইনের ক্যাসিনো ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি পশুর খাটাল থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন সেলিম প্রধান। রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তে ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটগুলোর নিয়ন্ত্রণ অনলাইন ক্যাসিনো গুরু সেলিমের হাতে। এসব পয়েন্ট থেকে মাসে কম করে হলেও ২০ কোটি চাঁদা তোলেন সেলিম প্রধান।

সোমবার গ্রেফতার সেলিম প্রধান অনলাইনে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী এবং বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রধান। তিনি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সহ-সভাপতি।এছাড়া এর আগে গ্রেফতার হওয়া বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার ক্যাশিয়ারও।

সেলিম প্রধানের ব্যাংককের পাতায়ায় বিলাসবহুল হোটেল, ডিসকো বারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনাই নয়, সেলিম প্রধান রাজশাহীসহ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা। এমনকি সীমান্তে জাল টাকার মূল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে।

প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি খাটাল, মাদক ও জাল টাকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা নেন। দুই বছরে তিনি সীমান্ত এলাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন।
গুলশানে তার মালিকানাধীন একটি স্পা সেন্টার রয়েছে। সেখানে চলে অনৈতিক কাজ। ওই স্পা সেন্টারে প্রশাসনের এক কর্মকর্তার যাতায়াত ছিল। পরে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি দুই বছর ধরে সীমান্তের খাটাল, মাদক ও জাল টাকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় গবাদিপশু থেকে রাজস্ব আদায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ২২টি খাটাল আছে।

বিজিবি এসব খাটালের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক খাটাল মালিক জানান, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খাটালের অনুমোদন পেলেও সেলিম প্রধানকে টাকা না দিলে গবাদিপশু রাখার অনুমতি পাওয়া যায় না।

প্রতিটি খাটাল থেকে সেলিম প্রধান ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত এককালীন টাকা নিয়েছেন। এরপরও খাটালে গবাদিপশু এলে প্রতিটিতে তাকে ৩ হাজার টাকা করে দিতে হতো। এজন্য খাটাল মালিকরা সেলিম প্রধানের নামে আলাদা করে টাকা তুলতে বাধ্য হয়েছেন।
এভাবে তিনি গত দুই বছরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্ত থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন।

এদিকে রোববার দৈনিক যুগান্তরে সেলিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কেনালকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘চাঁদাবাজিতেই কোটিপতি ইটভাটা শ্রমিক কেনাল।’

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর কেনাল ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। সেলিমের মালিকানাধীন স্পার জন্য ভারত থেকে চোরাইপথে প্রসাধনী ও মদ আসত।

চোরাই কারবার করতে গিয়েই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর গ্রামের এক সময়ের ভাটা শ্রমিক কেনাল আলীর সঙ্গে পরিচয় হয় সেলিমের। ভাটা শ্রমিক কেনাল হঠাৎ করেই সীমান্তে ভারতীয় গরু-মহিষ থেকে চাঁদা তোলা শুরু করেন।

স্থানীয় প্রশাসনও তাকে এই কাজে সহযোগিতা করতে থাকেন। একপর্যায়ে কেনালই হয়ে ওঠে সীমান্তের ডন। এই চাঁদা তোলার কাজে সে সহযোগী হিসেবে বেছে নেন কালুপুর গ্রামের রুবেল আলী ও বিস্ফোরক মামলার আসামি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের আবদুল খালেককে।

এই তিনজনের সিন্ডিকেট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে খাটালে আসা গরু-মহিষের জোড়ায় ১৯ হাজার ৫০০ টাকা করে চাঁদা তোলা শুরু করেন। সোমবারও এই অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তে কেনাল সিন্ডিকেট চাঁদা তুলেছেন বলে জানিয়েছেন গরু ব্যবসায়ীরা।

সেলিমের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকেই এরা সীমান্তে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। খাটালের চাদা, মাদকের চোরাচালসহ নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে মনিরুল ইসলাম নামের এক খাটাল মালিক অভিযোগ করেন, তিনি গত জুনে শিবগঞ্জের রঘুনাথপুর খাটালের অনুমোদন পান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।
বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও সেলিম প্রধানের লোকজন খাটালটি দখল করে রেখেছে। তারা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। খাটাল বন্ধ থাকায় তিনি এখন বেকার।

অন্যদিকে এলাকাবাসী জানিয়েছেন সীমান্তে ওঠা লাখ লাখ টাকা কুরিয়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য মাধ্যমে কেনাল প্রতিদিনই সেলিম প্রধানের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

অনলাইন ক্যাসিনো গুরু সেলিম প্রধানকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। সোমবার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে তিনি বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় থাই এয়ারওয়েজের ব্যাংককগামী একটি ফ্লাইট থেকে তাকে গ্রেফতার করে নামিয়ে আনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩২২ নম্বর ফ্লাইটটি দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে ব্যাংককের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ইউনিট ফ্লাইটে হাজির হলে সেটি বেলা ৩টায় ঢাকা ছেড়ে যায়। সেখান থেকেই সেলিম প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়।

সারা দেশে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের কারণে ভয়ে তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্যরা তার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন। এ কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি পালাতে পারেননি।

মতামত