১৬, অক্টোবর, ২০১৯, বুধবার

ক্যাসিনো ডনও, সেলিম যেন এক রূপকথা

থাই ডন নামেই পরিচিতি সেলিম প্রধান । অনলাইন ক্যাসিনো চালানোর কারণে তাকে ক্যাসিনো ডনও বলা হয়। চলাফেরা করেন কোটি টাকার ল্যান্ডক্রুজার গাড়িতে। সামনে পেছনে থাকে গাড়ির বহর। সঙ্গে থাকেন অস্ত্রধারী দেহরক্ষী। যানজটে পড়লে উচ্চ শব্দে তার চালক বাজায় হুটার। ট্রাফিক পুলিশ শব্দ শুনে ভিআইপি ভেবে সিগন্যাল ছেড়ে দেয়।

গাড়ি থেকে নামার সময় দরজা খুলে দেয় দেহরক্ষীরা। গাড়ি থেকে নামেনও ফিল্মি স্টাইলে। নামার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে রাখে দেহরক্ষীরা।

রাজকীয় হালে চলা এই ক্যাসিনো ডনের জীবন যেন এক রূপকথা। ১৯৮৮ সালে ভাগ্য বদল করতে পাড়ি জমান জাপানে। সেখানেই পরিচয় থাই ও কোরিয়ান নাগরিকের সঙ্গে। থাই বন্ধুর সঙ্গে থাইল্যান্ডে ব্যবসায় জড়ান। জাপানি বন্ধুকে নিয়ে বাংলাদেশেও ব্যবসা গড়েন। কোরিয়ান বন্ধুর পরামর্শে ২০১৮ সালে ঢাকায় গড়েন অনলাইন ক্যাসিনো হাট। এই ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে প্রতি মাসে আসে কোটি কোটি টাকা। এ টাকা হুন্ডি ও বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করতেন। সোমবার বিদেশে পালানোর সময় বিমানে ধরা পড়া সেলিমের বিষয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে চলা সেলিম প্রধান মূলত সুবিধাবাদী এক ব্যবসায়ী। ব্যবসা শুরুর সময় সেই সময়ের ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা নেন। তখন ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে সখ্যতা ছিল বলে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। মামুনকে দামি গাড়ি উপহার দেয়ার কথাও বলেছেন। আটকের পর সোমবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত সেলিমের গুলশানের কার্যালয় ও বনানীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা, টাকা, বিদেশি মদ, আট কোটি টাকার চেক, হরিণের চামড়া ও অনলাইন ক্যাসিনোর সার্ভার জব্দ করা হয়। আটক করা হয়েছে তার দুই সহযোগীকে। সম্প্রতি ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে সেলিম প্রধানের নাম উঠে আসে। এরপর থেকে গাঁঢাকা দেন। সোমবার থাই এয়ারওয়েজের টিজি ৩২২ ফ্লাইটে দেশ ছেড়ে বিদেশে পালানোর সময় র‌্যাব তাকে আটক করে।

সেলিমের ঘনিষ্ট সূত্র জানায়, শুধু অনলাইনে ক্যাসিনো ব্যবসা নয় সেলিম প্রধান রাষ্ট্রীয় একটি ব্যাংক থেকে শতকোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেননি। স্পা ও ম্যাসেজ সেন্টারের আড়ালে গড়ে তুলেছিলেন অবৈধ অসামাজিক ব্যবসা। এছাড়া দেশের বাইরে বড় অংকের বিনিয়োগ করে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। এসব ব্যবসার জন্য তিনি দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন শত কোটি টাকা। একাধিক বিয়েও করেছেন। থাইল্যান্ডের পাতায়া শহরে রয়েছে তার হোটেল ও ডিস্কো বার। এই বারে নিয়মিত নাচ-গান করেন বিভিন্ন দেশ থেকে বাছাই করা তরুণীরা। এছাড়া একাধিক ম্যাসেজ পার্লার, বিউটি পার্লার খোলেছেন পাতায়ায়। এসব পার্লারে ফিলপাইন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সুন্দরী তরুণীরা কাজ করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের টার্গেট করেই এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন তিনি। এসব ম্যাসেজ পার্লারে বাংলাদেশের অনেক ভিআইপিদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যেতেন সেলিম প্রধান। সেখানেই তাদের জন্য আমোদ-ফূর্তির ব্যবস্থা করতেন। পরে তাদের সেবার জন্য তাদেরই পরামর্শে থাইল্যান্ডের মত করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তিনি ম্যাসেজ পার্লার, স্পা সেন্টার চালু করেন। থাইল্যান্ডের ম্যাসেজ পার্লারে যেসব বিদেশি তরুণীরা কাজ করত তাদের ভিজিট ভিসা দিয়ে ঢাকায় এনে কাজ করাতেন। ঢাকার এসব ম্যাসেজ পার্লারে বিভিন্ন জগতের মানুষের আসা যাওয়া ছিল হর-হামেশা। প্রভাবশালী কেউ গেলে যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হত। মূলত তার ম্যাসেজ পার্লারে দেশি-বিদেশি তরুণীদের দিয়ে অবৈধ সব কার্যকলাপ করানো হত। ক্যাসিনোসহ তার অনেক অবৈধ ব্যবসা চালানোর জন্য যাদের সহযোগিতা লাগত সেলিম প্রধান তাদের নিয়মিত আমন্ত্রণ জানাতেন থাইল্যান্ড ও ঢাকার স্পা সেন্টারে।

দেশের প্রভাশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাদের হাতে রেখে এবং বখরা দিয়েই সে তার উদ্দেশ্য হাসিল করত। তাদের সহযোগিতায় সে বড় ধরনের অপকর্ম করে রেহাই পেয়ে যেত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনলাইন ক্যাসিনো ডন সেলিম বিয়ে করেছেন পাঁচটি। জাপানি, রাশিয়ান ও আমেরিকায় করেছেন তিনটি বিয়ে। আর বাংলাদেশে করেছেন দুটি। দেশ ছেড়ে পালিয়ে জাপানে থাকাবস্থায় তিনি জাপানি এক নারীকে বিয়ে করেন। তাকে নিয়ে থাকতেন টোকিওতে। দুজন মিলেই টোকিওতে ব্যবসা করতেন। ব্যবসা করার সময় সেলিম জড়িয়ে পড়েন নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। পরে সেখান থেকে পালিয়ে চলে যান আমেরিকা। সেখানে গিয়েও আরেক নারীকে বিয়ে করেন। পরে ফের তিনি জাপানে চলে আসেন। কিন্তু জাপানের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। কিছুদিন পর দেশে পাঠিয়ে দেয়। সূত্র বলছে, সেলিম যে দেশেই যেতেন সেখানেই একটি করে বিয়ে করতেন। এটি তার একটি কৌশল ছিল।

অভিযানে যা পাওয়া গেল: এদিকে সেলিম প্রধানের গুলশানের কার্যালয় ও বনানীর বাসায় অভিযান চালানোর পর র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক ও র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, র‌্যাবের সাইবার মনিটরিং সেলে আমরা জানতে পারি যে, দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অনলাইনে ক্যাসিনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য আমরা নজরদারি বৃদ্ধি করি। তারই প্রেক্ষিতে সোমবার দুপুরে অনলাইন ক্যাসিনোর দলনেতা সেলিম প্রধান বিদেশে চলে যাচ্ছে এমন সংবাদ আমরা পাই। এ খবর পেয়ে দ্রুত র‌্যাবের একটি টিম বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে তাকে বিমান থেকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হই। তিনি আরও জানান, তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তার বনানীর বাসা ও গুলশানের অফিসে অভিযান চালানো হয়।

তার অফিস ও বাসা থেকে ৪৮ বোতল বিদেশি মদ, নগদ ২৯ লাখ ৫৫০০ টাকা, ২৩ টি দেশের ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার ২৩ টাকা মূল্যের মুদ্রা, ১২ টি পাসপোর্ট, ১৩ টি ব্যাংকের ৩২ টি চেকবই, ২ টি হরিণের চামড়া, ১ টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সেলিমসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যরা হচ্ছেন, মো: আকতারুজ্জামান ও রোকন উদ্দিন।
তিনি জানান, সেলিমকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সেলিম ১৯৭৩ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে জাপানে চলে যান। সেখানে তিনি গাড়ি ব্যবসা শুরু করেন। পরে এক জাপানি নাগরিকের সঙ্গে তিনি থাইল্যান্ডে চলে যান। সেখানে তিনি শিপের ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে থাইল্যান্ডে মিস্টার দো নামে এক কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে পরিচয় হয়। মিস্টার দো তাকে বাংলাদেশে নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তাব করেন। এর পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনো খোলারও পরামর্শ দেন। ওই অনলাইন ক্যাসিনো থেকে লাভ আসবে তার ফিফটি ফিফটি ভাগ হবে বলে তাদের মধ্যে মৌখিক চুক্তি হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে তিনি অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করেন। ওই কোরীয় নাগরিক দো মাঝে মাঝে বাংলাদেশে এসে অনলাইন থেকে তার যে লাভ তা ব্যাংকিং চ্যানেল বা হুন্ডির মাধ্যমে নিয়ে যেতেন। তিনি আরও জানান, সেলিমের যে অফিসে অভিযান চালানো হয়েছে সেখানে একটি কম্পিউটারে দেখা যায় যে, সেলিমের যে ওয়েবসাইট রয়েছে সেখানে তিনি নিজেকে অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। একটি সার্ভারে দেখা যায়, সেখানে দুইটি অনলাইন ক্যাসিনো অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণ করা আছে। একটি পি ২১ এবং আরেকটি পি-২৪। আমরা ওই সার্ভারটি জব্দ করেছি। এটা মূলত ভার্চুয়াল ক্যাসিনো।

সফটওয়ারের মাধ্যমে খেলা যায়। খেলার আগেই তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পরিশোধ করতে হয়। র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক আরও জানান, ওই ক্যাসিনো খেলার নিয়ম হচ্ছে যে, প্রথমে একজন জুয়াড়িকে মোবাইলে টি-২১ ও পি-২৪ নামের দুটি অ্যাপস ডাউনলোড করতে হতো। পরে অ্যাপসগুলো থেকে তার পছন্দমতো গেম বাছাই করতেন। এরপর শুরু হতো খেলা। জিতলে টাকা জমা হতো জুয়াড়ির নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউনে, আর হারলে টাকা কাটা যেত ওই একই অ্যাকাউন্ট থেকে।

তিনি আরও জানান, অনলাইনে ক্যাসিনো কার্যক্রমে অংশ নেয়ার আগে প্রত্যেক জুয়াড়িকে নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হতো। এখন পর্যন্ত এমন ৩ টি ব্যাংকের নাম জানা গেছে। ব্যাংকগুলো হলো কমার্শিয়াল ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক ও সিলং ব্যাংক। অ্যাকাউন্টগুলোয় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখতে হতো। খেলায় জিতলে বা হারলে ওই অ্যাকাউন্টে টাকা যোগ হতো বা কাটা যেত। সম্পূর্ণ লেনদেন হতো একটি গেটওয়ের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত একটি গেটওয়ের সন্ধান পেয়েছে র?্যাব। সন্ধান পাওয়া ওই গেটওয়েতে কেবল ১ মাসেই প্রায় ৯ কোটি টাকা জমা হয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এমন একাধিক গেটওয়ে আছে। ওইসব গেটওয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখানে বোঝা যায় যে, একটি মোটা অংকের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, ক্যাসিনোর টাকা ব্যাংক আক্যাউন্টে জড়ো হলে সেলিমের সহকর্মীরা নগদে টাকা তুলে নিয়ে আসতো। ওইসব টাকা লন্ডন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। আর সেলিমের প্রধান সহযোগী মিস্টার দো বাংলাদেশে এসে তিনি ওই টাকা নিয়ে যেতেন।

তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইন, বৈদেশিক মুদ্রা আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের ভ্রামমাণ আদালতের মাজিষ্ট্রেট সারোয়ার আলম, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের সহকারী পরিচালক সিনিয়র এএসপি মিজানূর রহমান ভূঁইয়া, র‌্যাব-১ এর কর্মকর্তা (অপারেশন) এসি সুজয় সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: মানবজমিন।

মতামত